
দক্ষিণ আমেরিকায় ৩ মাসে আয় ১৯ কোটি ডলার
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উত্তর আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত রপ্তানি বাজারগুলোর ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে অপ্রচলিত আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্যসামগ্রীর নতুন দুয়ার উন্মোচনের সুনির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও হস্তশিল্পজাত পণ্যের জন্য বিকল্প বাজার খুঁজে পেতে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই অব্যাহত প্রচেষ্টার সুফল হিসেবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে বাংলাদেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি আয় ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে বর্তমানে ব্রাজিল, চিলি ও পেরু বাংলাদেশের প্রধান এবং সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে দ্রুত উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা গণমাধ্যমের সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ব্রাজিলে ৭ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের সর্বাবস্থায় গুণগত মানসম্পন্ন বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে আরেক প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চিলিতে এই তিন মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতি পেরুতে ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, কলম্বিয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার ডলার, উরুগুয়েতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং ফুটবল খ্যাত আর্জেন্টিনায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের দেশীয় পণ্য সফলভাবে রপ্তানি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে বাংলাদেশের বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা এখনও অদ্যবধি অব্যবহৃত রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও কানাডার বাজারে মনোযোগ দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা জটিলতা তৈরি হওয়ায় বাজার বৈচিত্র্যায়ণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে তৈরি পোশাক খাতই বাংলাদেশের মূল রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে, তবে এর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্য, আন্তর্জাতিক মানের চামড়াজাত সামগ্রী, আধুনিক গৃহসজ্জা সামগ্রী, অনন্য কারুশিল্প ও লাইফস্টাইল বা জীবনযাপন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিপুল বাজার সম্প্রসারণের বৈচিত্র্যময় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই নতুন ও উদীয়মান বাজার দখলের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ব্রাজিলের বৃহত্তম শিল্প ও ব্যবসা নগরী সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘হোম শো ব্রাজিল ২০২৬’ প্রদর্শনীতে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে অংশ নেয় বাংলাদেশ। গণমাধ্যমের অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণী সহায়তায় এবং ব্রাসিলিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের দক্ষ সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় দেশের ৪টি শীর্ষস্থানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এ প্রদর্শনীতে তাদের সর্বাধুনিক পণ্য সম্ভার প্রদর্শন করে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল—জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মাদার ট্যানারি, রেইনবো জুট ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস। প্রদর্শনীতে পাঁচটি সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন বুথ স্থাপন করে বাংলাদেশি সামগ্রী বিশ্বমানের আমদানিকারকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে পরিবেশবান্ধব নান্দনিক পাটজাত সামগ্রী, পরিবেশবান্ধব ফাইবার ব্যাগ, বৈচিত্র্যময় চামড়াজাত পণ্য, প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি দৃষ্টিনন্দন ঝুড়ি, গৃহসজ্জার বিলাস সামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত বাঁশের পণ্য, ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা, মজিদ ও নকশী মাটির তৈজসপত্র এবং হস্তশিল্পের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা প্রদর্শন করে ব্যাপক প্রশংসিত হয় বাংলাদেশ। একই সাথে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রচারমূলক তথ্য-বুথ স্থাপন করে বিদেশী আমদানিকারকদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এসব সরাসরি ব্যবসায়িক আলোচনা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় রপ্তানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং দক্ষিণ আমেরিকার সাথে বাণিজ্যের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে গণমাধ্যমের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানান, বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনা এবং বিশ্বজুড়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। প্রথাগত গুটিকয়েক দেশের ওপর রপ্তানির অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক ঝুঁকি ও মন্দার মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই আমরা এখন লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি জোরালো করছি।
গণমাধ্যম প্রধান আরও যোগ করেন, কোনো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী বা মেলায় অংশ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বাজারের ভোক্তার পছন্দ, চাহিদা, খুচরা মূল্য, স্থানীয় প্রতিযোগী ও ব্যবসায়িক রীতিনীতি নিয়ে গভীর গবেষণা করা প্রয়োজন। আমরা এখন থেকে রপ্তানিকারকদের আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছি যেন মেলায় অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি অর্ডারে রূপ নেয়। দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে আমাদের পণ্যের ব্র্যান্ডিং বাড়াতে এবং জাতীয় প্যাভিলিয়নের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে আমরা আরও বেশি পেশাদার পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।
রপ্তানি আয়ের খাতওয়ারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশে বাংলাদেশের মোট ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের রপ্তানি আয়ের মধ্যে প্রায় ৭৯.২ শতাংশই জোগান দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক খাত। এর মধ্যে ওভেন কাপড়ের পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং নিট পোশাক থেকে এসেছে ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। এ দুটি পোশাক খাত মিলিয়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার।